ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন গ্লো অ্যান্ড লাভলী?

 

        

•ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির পরিচয় কি?

সাউথ এশিয়া ও সাউথ ইস্ট এশিয়ার একটি অন্যতম একটি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট।বাংলাদেশ , পাকিস্তান , ইন্ডিয়ার পাশাপশি ইন্দোনেশিয়া , মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা এই দেশগুলোতে ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করার একটি অন্যতম নাম হচ্ছে এই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি।সাউথ এশিয়া ও সাউথ ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোতে সুন্দর ত্বক বলতে ফর্সা ত্বক জের তাদেরকে বুঝানো হয়।এই সব দেশে ত্বকের কালো রংকে অসুন্দর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।মূলত এই রকম আজব চিন্তা ভাবনার কারণে সাউথ এশিয়া ও সাউথ ইস্ট এশিয়ার ত্বক ফর্সা করার ক্রিম তৈরি করা মার্কেটগুলো অনেক লাভবান হচ্ছে।১৯৭৫ সালে ভারতের বাজারে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বিক্রি করার পর ইউনিলিভার মানুষের এই আজব চিন্তা ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ত্বক ফর্সাকারী এই ক্রিম এখন বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।তবে কিছু বছর ধরে বাংলাদেশ ও ভারতে এই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ক্রিমটি বিক্রি হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমটিকে গ্লো অ্যান্ড লাভলি ক্রিম নাম দিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।এখন প্রশ্ন হলো এত জনপ্রিয় ক্রিমের নামকে কেনো পরিবর্তন করা হলো?

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন গ্লো অ্যান্ড লাভলী?

•ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির ইতিহাস কি?

 উইলিয়াম লেবার আর জেমস লেবার নামে এই দুই ব্যক্তি ১৮৮০ সালে লেবার ব্রাদার্স নামে সাবান প্রস্তুতকারী সংস্থা তৈরি করে।এরপর ১৯২৯ সালে মার্গেরিন ইউনি আর লেবার ব্রাদার্স মিলে গঠন করা হয় ইউনিলিভার। হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড ১৯৩১ সালে তাদের যাত্রা শুরু করে হিন্দুস্তান ভানাস্পাতি মেনুফেকচারিং কোম্পানি নাম দিয়ে।১৯৬৪ সালে লেভার ব্রাদার্স নামে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে কোম্পানিটি।১৯৭১ সালে ইউনিলিভার নিয়াছিনামাইড আর মেলামাইন সাপ্রেসরের বেডেন্টটি নিয়ে নেয় যা ফেয়ার এন্ড লাভলি আসল জিনিস।পরবর্তীতে ফেয়ার এন্ড লাভলির ব্র্যান্ড পেটেন্ট করে নেয় তারা। ১৯৭৫ সালে ইন্ডিয়ার মার্কেটে সর্বপ্রথম ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি প্রোডাক্টটি নিয়ে আসে তারা।আস্তে আস্তে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশেও এই প্রোডাক্ট বেচাকেনা শুরু করে তারা।এরপর তারা ত্বকের বিভিন্ন ধরন অনুযায়ী ফেয়ার এন্ড লাভলির পাশাপাশি এই রকম আরো ক্রিম বিক্রি করা শুরু করে তারা।যেমন: আয়ুর্বেদিক ক্রিম , বিবি ক্রিম , ফেইস ওয়াশ ইত্যাদি।আসলে তাদের এই প্রোডাক্ট ব্যবহার করার বয়স নির্ধারিত ছিল।এই বয়সের সীমা ছিল ১৮-৩২ বয়সী নারীরা।কিন্তু ১২-১৮ বছর বয়সী কিশোরীরাও এই ক্রিম ব্যবহার করা শুরু করে।এরপর তারা ছেলেদের জন্যও ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মেন নামে ক্রিমটি বাজারে নিয়ে আসে। বাংলাদেশ পাশাপাশি ভারতেও এর বিশাল মার্কেট রয়েছে।ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন গ্লো অ্যান্ড লাভলী?

•ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি কেনো এতো জনপ্রিয়?

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি প্রথম থেকেই নির্বাচনী টার্গেটিং কৌশল অনুসরণ করা শুরু করে।মানুষের মধ্যে সৌন্দর্য মানে ফর্সা এই কথাটাকে কাজে লাগিয়ে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি সবসময় তাদের এই টিভি কমার্শিয়াল বিজ্ঞাপনকে প্রচার করে আসছে।এই ধরনের নির্বাচনী টার্গেটিং কৌশল মাধ্যমে যারা বলে সৌন্দর্য মানে ফর্সা তাদের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির অ্যাডগুলোতে ইউনিলিভার এই মেসেজটি দিয়ে আসছে যে কালো মানে অসুন্দর নয়।এছাড়া ভালো চাকরি হতে , বিয়ে হতে , মেধাবী হতেও ফর্সা হতে হবে এমন ধরনের মেসেজও দিত কোম্পানিটি।যেমন: ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির অ্যাডে দেখা যায় যে কালো হওয়ায় একটি মেয়ে অভিনেত্রী হতে পারছে না তাই পরবর্তীতে সেই মেয়েটি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্যবহার করে ফর্সা হয়ে যান এবং অভিনেত্রী হয়ে যান সহজেই।অন্যদিকে আরেকটি অ্যাডে একটি মেয়ে এয়ারহোস্টেস হতে চাই কিন্তু গায়ের রং কালো হওয়ায় সে হতে পারছিল না।সে টিভিতে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির অ্যাড দেখেন তারপর সে সেই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্যবহার করে ফর্সা হয়ে যায় এবং এয়ারহোস্টেস হিসেবে যুক্ত হয়।গ্ল্যামার জগতে কালারিজাম নামে একটি বিষয় খুবই পরিচিত।মূলত কালো গায়ের রঙের উপর নির্ভর করে বৈষম্য করাকে কলারিজাম বলা হয়ে থাকে।ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির অ্যাডগুলো ভারত উপমহাদেশ ও এশিয়ার বর্ণবাদের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ।এশিয়ার দেশগুলোতে ভোক্তারা তেমন শক্তিশালী নয়।এর ফলে ইউনিলিভার ও ফায়ার অ্যান্ড লাভলি ত্বক ফর্সাকারি ক্রিম এবং জি য়ে স্কে হরলিক্সকে বাচ্চাদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং এরকম মেসেজ দেয়ার মাধ্যমে এগুলো তাদের শিশুদের জন্য কিনতে সবাই আকর্ষিত হয়েছিল।ওদিকে ভারত বা বাংলাদেশসহ অধিকাংশই মানুষই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কারণে বিশাল এক জনগোষ্ঠী তাদের বিউটি প্রোডাক্ট বা স্কিনের যত্ন নেয়ার দিকে বেশি জোর দেয়।এসব অঞ্চলের মানুষের বাজে চিন্তার কারণে একইরকম বিজ্ঞাপন প্রকাশের পাশাপাশি ইউনিলিভার ক্রয়ক্ষমতার দিকেও বেশি ফোকাস করেছিল।তাই ইউনিলিভার ২৫ গ্রামের প্যাকেও ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বাজারজাত করেছিল।এর ফলে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি সবার ক্রয়ক্ষমতার কাছে চলে এসেছিল।ক্রয়ক্ষমতার পাশাপাশি নির্বাচনী টার্গেটিং এর মাধ্যমে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মূলত এশিয়ায় অনেক সফলতা অর্জন করে নিয়েছিল।এই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ছাড়াও লোরিয়াল আর জনসন অ্যান্ড জনসনসহ ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন মার্কেটে ত্বক ফর্সাকারি ক্রিম বিক্রি করা শুরু হয়েছিল।এসব ক্রিমের মার্কেটিং কৌশল ও বিজ্ঞাপন এমন ছিল যেনো মানুষ যাতে এটি কেনার জন্য আগ্রহী হয় বলা যায় প্রায় ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির বিজ্ঞাপনের মতোই।তবে এত সব পণ্যের মাঝে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি সবার শেষে অবস্থান করে আছে।এক তথ্যসূত্র অনুযায়ী ২০২০ সালের মার্চ মাসে ভারতের ত্বকের রঙ ফর্সাকারী প্রোডাক্টের জন্য খরচ হয়েছে ৫,৮০০ কোটি রুপি।এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উজ্জ্বলতার ক্রিম , হাত ও শরীরের লোশন , মুখ পরিষ্কার ও ব্লিচ ক্রিম।প্রায় ৪ হাজার কোটি রুপি নিয়ে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ভারতের বাজারের ত্বক ফর্সাকারী পণ্যের মধ্যে মার্কেট লিডার।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর তথ্য অনুযায়ী বিউটি প্রোডাক্টের মার্কেটে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি নির্মাতা ইউনিলিভার ৪৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে।চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পর ২০২০ সালে ইউনিলিভার তাদের অন্যতম সফল প্রোডাক্টের নাম পরিবর্তন করে গ্লো অ্যান্ড লাভলি এই নাম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।যার প্রেক্ষিতে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি তাদের সকল প্যাকেজিং পরিবর্তন করে গ্লো অ্যান্ড লাভলি করা হয় এবং ব্র্যান্ডটি মার্কেটিং মেসেজে নিয়ে আসায় এমন পরিবর্তন।ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন গ্লো অ্যান্ড লাভলী?

•গ্লো অ্যান্ড লাভলি নামটি কিভাবে এলো?

ভারতের বেশকিছু ভোক্তারা অনেক বছর থেকেই ইউনিলিভারকে তাদের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির নাম ও বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত মেসেজিং পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়ার পাশাপাশি জনগণের মত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল।এমনিতেই ২০১৬ সালে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির অ্যাডভারটাইজিংগুলোর বিরুদ্ধে হেসটেগ আন ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি সোসিয়াল মিডিয়াতে প্রচারিত হতে থাকে।যদিও বিষয়টি মানুষ তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।তবে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ধীরে ধীরে তাদের অ্যাডভারটাইজিং মেসেজের পরিবর্তন করা শুরু করে।২০১৯ সালের শুরুর দিকে কোম্পানিটি তাদের মেসেজে ফেয়ারনেস , ফর্সা আর স্কিম উজ্জ্বলতার বিষয়টি পরিবর্তন করে গ্লো , ইভেন টোন ,স্কিন রেডিয়েন্স এবং ক্লারিটির দিকে গুরুত্ব দিয়ে অ্যাড বানানো শুরু করে।এছাড়া ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির আগের অ্যাডগুলো বাদ দেয়া হয়।এদিকে ২০২০ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রে জজ ফ্লাই নামে খ্রিস্টান পুলিশের গুলিতে একজন কালো রঙের মানুষ মারা যায়।এই ঘটনার পর সবাই ওই মৃত ব্যক্তিটির জন্য বিক্ষোভ করে এবং তাদের মুক্ষ বিষয় ছিল BLACK LIVES MATTER।যুক্তরাষ্ট্রে এই আন্দোলন রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য দেশের জনগণ তাদের সোসিয়াল মিডিয়াতে নিজেদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল।সে সময় ব্র্যান্ডগুলো একে একে তাদের প্রোডাক্ট এর অ্যাড থেকে (ফর্সাই যে একজন মানুষের সৌন্দর্যের মূল বিষয়) এই বিষয়টি বাদ দেয়া শুরু করে। যার ফলে বিশ্বের সব ত্বকের রং ফর্সাকারী ক্রিম যারা এতদিন এই মেসেজ দিয়ে আসছিল তাদের উপর জনগন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।আবার একটি অনলাইন পোর্টালে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ব্যান্ড করার জন্য উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল।১৬ হাজারের বেশি মানুষ এই পোর্টালে অংশগ্রহণ করে এবং দিন দিন এর সংখ্যা বাড়তেই থাকে।এর কিছুদিন পরই মানুষ শান্ত হওয়ার পর এই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি নাম পরিবর্তন করে গ্লো অ্যান্ড লাভলি করা হয়।ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন গ্লো অ্যান্ড লাভলী?

তো আজকে এই পর্যন্তই।আশা করি আপনারা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি কেনো গ্লো অ্যান্ড লাভলি হয়েছে এটি আপনারা জেনেছেন।আল্লাহ হাফেজ সবাইকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.