মৃত সাগর কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল?কি কেনো কিভাবে

মৃত সাগর কি?

মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত Dead Sea বা মৃত সাগর প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো সাগর নয়।এটি মূলত হচ্ছে একটি হ্রদ।পৃথিবীর অন্যান্য সাগরের তুলনায় মৃত সাগরের পানি দশ গুন বেশি লবণাক্ত কারণে এই জলে কোনো উদ্ভিদ বা মাছ বাঁচতে পারে না।আর তাই এর নাম দেয়া হয়েছে মৃত সাগর। অত্যাদিক লবণের উপস্থিতির কারণে মৃত সাগরের পানির প্লবতা এতই বেশি যেখানে আপনি অনায়াসে হাত পা ছড়িয়ে রেখে বেশে থাকতে পারবেন।এমনকি আপনি সাতার কাটতে না জানলেও কিছুতেই এখানে ডুবে যাবেন না।মৃত সাগরের পৃষ্ঠভাগ স্বাভাবিক পৃথিবীর সমুদ্র পৃষ্ঠভাগ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার নিচে অবস্থিত।তাই একে ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিম্নভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর অন্যতম এক বিস্ময় মৃত সাগর সম্পর্কে জানবো কি কেনো কিভাবে এর ওয়েব পেজের এই আর্টিকেল থেকে।মৃত সাগরে কেনো জীব বাচঁতে পারে না?

আরও পড়ুন – ইউটিউব শর্টস থেকে কিভাবে উপার্জন করবে?

মৃত সাগর কোথায় অবস্থিত?সংক্ষেপে এর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাক!

মৃত সাগরের পূর্ব সীমান্তে রয়েছে জর্ডান এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন। প্রায় ত্রিশ লক্ষ বছর আগে জর্ডান নদী, মৃত সাগর এবং ওয়াদি আরাবা অঞ্চল লোহিত সাগরের পানিতে একাধিক বার প্লাবিত হওয়ার ফলে একটি সরু উপসাগরের সৃষ্টি হয়। উপসাগরটি জেজরিল উপত্যকায় একটি সরু সংযোগের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত ছিল।পরবর্তীতে প্রায় বিশ লক্ষ বছর আগে জেজরিল উপত্যকায় ও ভুমন্ত সাগরের মধ্যবর্তী স্থলভাগ ধীরে ধীরে উচু হয়ে যেতে থাকে।এক পর্যায়ে এই উপসাগরটি ভূমি ধারা পরিবেষ্টিত হতে হতে এক বিশাল হ্রদে পরিণত হয়। বর্তমানে এই হ্রদের সর্বোচ্চ গভীরতা ১২৪০ ফুট এবং এর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৬৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ সর্বোচ্চ ১৮ কিলোমিটার।মৃত সাগরের জলে ভেসে থাকার জন্য আপনাকে কিছু করতেই হবে না।যারা একটুও সাতার জানেন না তারাও এখানে নিশ্চিন্তে ভেসে থাকতে পারবেন।এমনকি আপনি চাইলেও এই মৃত সাগরের জলে ডুবে যেতে পারবেন না।সাগরের অত্যন্ত লবনাক্ততার কারণে এই জলের প্লবতা অনেক বেশি।প্লবতা হচ্ছে পানিতে ভাসমান কোনো বস্তুর উপর পানির ঊর্ধ্বমুখী বল।কোনো বস্তুকে এই পানিতে ছেড়ে দেয়া হলে বস্তুর ওজন নিচের দিকে একটা বল প্রয়োগ করে সেই সাথে পানিও পি বস্তুটিকে উপরের দিকে ঠেলে দেয়।যদি এখানে বস্তুর ফোন বেশি তাহলে বস্তু ডুবে যায় আর যদি পানির ঊর্ধ্বমুখী বল বেশি তাহলে বস্তুটি পানিতে ভেসে থাকে।অর্থাৎ পানিতে কোনো ভাসমান বস্তুর উপর প্রযুক্ত পানির ঊর্ধ্বমুখী বলই হচ্ছে প্লবতা।মৃত সাগরের পানির অধিক প্লবতার কারণেই এখানে অনায়াসে ভেসে থাকা যায়।মৃত সাগরের পানির প্লবতা এত বেশি হওয়ার কারণ হলো এই জলে রয়েছে অধিক পরিমাণে লবণাক্ততা।এই পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ প্রায় ৩৪.২ শতাংশ।অর্থাৎ মৃত সাগরের ১০০ গ্রাম পানিতে প্রায় ৩৪ গ্রামই লবণ যা সাধারণ অন্য কোনো সাগরের লবণাক্ততার তুলনায় দশ গুণ বেশি লবণাক্ত।অন্যান্য মহাসাগরের পানি ও মৃত সাগরের পানিতে মিশে থাকা খনিজ উপাদান গুলোর মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে।মৃত সাগরে বিদ্যমান লবণে রয়েছে (ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ৫০ শতাংশ, সোডিয়াম ক্লোরাইড ৩০ শতাংশ, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ১৪ শতাংশ এবং পটাসিয়াম ক্লোরাইড ৪ শতাংশ।এই অত্যাধিক পরিমাণের লবণাক্ততার কারণে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণী এমনকি উদ্ভিদও বসবাস করতে পারে না।এই জলাভূমিতে কোনো প্রাণী বেচেঁ থাকতে পারে না বলেই এই সাগরের নাম দেয়া হয়েছে মৃত সাগর।তবে সম্প্রতি এখানে সামান্য কিছু ব্যাকক্টেরিয়া ও ছত্রাক জাতীয় কিছু অণুজীবের সন্ধান পাওয়া গেছে।মৃত সাগর অঞ্চলটি তিন দিন চিকিৎসা শাস্ত্রের গবেষণার জন্য তীর্থ স্থানে পরিণত হয়ে উঠছে।প্রাকৃতিকভাবে হ্রদের পানিতে খনিজ দ্রব্যদির বিপুল উপস্থিতি, বাতাসে এলার্জির উৎপাদক দ্রব্য, পরাগরেণুর স্বল্পতা,উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, সৌর বিকিরণে অতি বেগুনির রশ্মির কম উপস্থিতি ইত্যাদি কারণে মৃত সাগর অঞ্চলটি মানব শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী ও আরামদায়ক।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক নিচুতে অবস্থান হওয়ার কারণে পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানে তুলনায় এই মৃত সাগরের অঞ্চলের অক্সিজেনের পরিমাণ বা মাত্রা প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।এখানকার বায়ু প্রাকৃতিক ভাবেই উৎফুল্ল বা মজার বলা যায়।এখানের পানিতে ভেসে থাকলে শরীরে একটি অসাধারণ শান্তি অনুভূত হয়।বিশেষ করে শ্বাস কষ্টে ভুগে থাকেন যেসব রোগীরা তাদের জন্য এখানকার উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বেশ উপকারী।এছাড়া মৃত সাগরের জলের পাশে থাকা লবণাক্ত কাদা ঔষুদি ও প্রসাধনী ভাবেই প্রসিদ্ধ।নানা ধরনের চরম রোগের চিকিৎসায় এই ধরনের কাদা ব্যবহার করা হয়।এছাড়া পর্যটকেরা প্রাকৃতিক প্রসাধনী হিসেবে এই কাদা গায়ে মেখে সূর্যের আলোতে বসে থাকেন।এই অঞ্চলের সূর্যের রশ্মিতে রয়েছে অতি বেগুনির রশ্মির স্বল্পতা সূর্যস্থানের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে থাকে।বিগত কয়েক শতাব্দীতে মৃত সাগরের আয়তন এতটা পরিবর্তিত হয়েছে যে যার পরিমাণ অনেক বেশি।বর্তমানে এই সাগরের গভীরতা সবচেয়ে কম।অতীতে বহুবার মৃত সাগরের গভীরতা কমে গেলেও তা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার বিভিন্ন ব্যাবস্থা ছিল।কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সাগরের বৃদ্ধির আর কোনো সুযোগ নেই।কারণ ১৯৬০ এর দশকে ইসরাইল মৃত সাগরে পতিত জর্ডান নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।জর্ডানও তাদের ইয়ার্মুখ নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দিলে কার্যত মৃত সাগর অবদ্ধ হয়ে পরে।এরপর থেকে বাইরের কোনো প্রাকৃতিক পানির উৎস মৃত সাগরে গিয়ে পতিত হয় নাই।বিগত মাত্র ৫০ বছরে মৃত সাগর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মিটারেরও বেশি নিচে নেমে গেছে।সমুদ্রের পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে বেড়ে গেছে এই জলের লবণের পরিমাণ।মৃত সাগরের কোনো প্রাকৃতিক শাখা প্রশাখা না থাকায় শুধুমাত্র সূর্যের তাপে এই সাগরের পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়।পানি বাষ্প হয়ে উড়ে গেলেও এতে দ্রবীভূত লবণ তলানি হিসেবে পড়ে থাকে।ফলে দিন দিন এই সাগরের পানি লবণাক্ত পানিতে পরিণত হচ্ছে।প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ মিটার করে এই সাগরের জলের স্থর নিচে নেমে যায়।পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থান দিন দিন আরো নিচু থেকে আরো নিচুতর হয়ে যাচ্ছে।খনিজ উপাদানে ভরপুর ভৌগলিকভাবে অনুপম এই মৃত সাগর বর্তমানে প্রায় মৃত হয়ে আছে।এই সাগরকে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যাবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেই।যেখানে যেভাবে খুশি গড়ে তোলা হচ্ছে বিলাসবহুল হোটেল।ইসরাইল ও জর্ডান মৃত সাগরের সংরক্ষণে এখনও পর্যন্ত একত্রিত হয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।বরং মৃত সাগর পাড়ে কে কার আগে বেশি বেশি অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে তার জন্য ইসরাইলি ও জর্ডানিয়ানদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলছে।এখানকার খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার চলছে মৃত সাগর পারের এই দুই দেশের মধ্যে।মৃত সাগরের জলে মিশে থাকা পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,ক্যালসিয়াম এবং লবণ আহরণের জন্য ইসরাইল ও জর্ডানের দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা।এসব কারখানার কাছ মালের জন্য সাগরের মূল্যবান জল কৃত্রিমভাবে খননকৃত খালের মাধ্যম প্রবাহিত করা হয়।অগভীর এসব খালে প্রবাহিত সমুদ্রের জল সূর্যের তাপে দ্রুত বাষ্প হয়ে যায় আর নিচে তলানি হিসেবে পড়ে থাকে মূল্যবান খনিজ লবণ।দুটি দেশের জন্যই এটি অনেক লাভজনক ব্যবসা।কিন্তু সামান্য কিছু ব্যবসায়িক মুনাফার জন্য ইসরাইল ও জর্ডানের কারখানাগুলো মৃত সাগরের প্রায় অর্ধেক জল অতি দ্রুত বাষ্প হয়ে উড়িয়ে দিয়েছে।মৃত সাগরের পাড়ে গড়ে উঠা অনিয়ন্ত্রিত শিল্প কারখানার কারণে দিন দিন আরো হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে এই হ্রদটি।এসব কারখানাগুলো মৃত সাগরকে মেরে ফেলার জন্য সরাসরিভাবে জড়িত।মৃত সাগরের খনিজ সম্পদ অস্বাভাবিক মাত্রায় আহরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একে ধ্বংস করার পেছনে সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা পালন করছে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র ইসরাইল।উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপ থেকে আশা ইহুদীরা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের সক্রিয় সহায়তায় ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন করার পর থেকেই এই অঞ্চলে অশান্তি লেগেই আছে।ইসরাইল ও ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব শুরুটাও ঠিক তখন থেকেই।এখনও পর্যন্ত চলমান রয়েছে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব।

আপনি যদি কি কেনো কিভাবে ওয়েবসাইটে নতুন হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে আমাদের আগের আর্টিকেলগুলোও পড়বেন দয়া করে।আশা করি মৃত সাগরের নিয়ে আজকের এই আলোচনা ভালো লেগেছে আপনাদের।আপনি পরবর্তীতে কোন বিষয় নিয়ে আর্টিকেল চান সেটাও আপনি কমেন্ট বক্সে জানতে পারেন।আপনাদের এই আর্টিকেলটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।আজকে এই পর্যন্তই।সবাইকে আল্লাহ হাফেজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.