কেনো মানুষ শুচিবাই রোগে আক্রান্ত হয়?

 দীপিকা পাডুকোন হচ্ছেন একজন বলিউড তারকা।দুনিয়া জুড়ে কোটি কোটি ভক্ত তার। অর্থক্ষ্যাতি কোনো কিছুরই তার অভাব নেই।বিয়ে করেছেন বছর দুই এক আগে। ভদ্র মহিলা খুব সুখেই আছেন।

কিন্তু কয়েক বছর আগেও আক্রান্ত ছিলেন ভয়াবহ একটি মানসিক চাপে। ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর নায়িকা তখনও তিনি ছিলেন।যখনও মানসিক রোগের কারণে সে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইতো।দীপিকার এই ডিপ্রেশনের তালে একটি বাড়তি হাওয়া দিয়েছিল একটা অসুখ যেটাকে ইংরেজিতে বলা হয় —
(OBSESSIVE COMPULSIVE DISORDER) বা (OCD) যাকে বাংলায় বলা হয় (শুচিবাই)।শুনতে খুবই সাধারণ একটা অসুখ মনে হচ্ছে তাই না।এই রোগটিকে সাধারণ বলে হেলফেলা করা হয় বলে এটিকে আমরা গুরুত্ব দেই না।সেই সুযোগেই ডাল-পালা বড় হয়ে উঠে এই রোগের আগাছা।একটি বড় রোগের আকার ধারন করে।ফলে তৈরি হয় যন্ত্রণা।আর এই যন্ত্রণা ডিপ্রেশনের থেকেও অনেক অনেক বেশি কষ্টের।
কেনো মানুষ  শুচিবাই রোগে আক্রান্ত হয়?

OBSESSIVE COMPULSIVE DISORDER এই রোগে আক্রান্ত মানুষের পরিমাণ কেমন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় সাত লক্ষ মানুষ
আত্মহত্যা করে।এর মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে মানুসিক যন্ত্রণাOBSESSIVE COMPULSIVE DISORDE বা OCD রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হয়তো আত্মহত্যা করতে খুব কমই যায়।কিন্তু যে জীবনটা তারা ওই সময়টাতে পার করে তা মৃত্যুর থেকে কম যন্ত্রণার নয়।এটি এমনই এক রোগ যে রোগের কোনো কারণ জানা নেই, জানা নেই কোনো প্রতিকারের উপায়। ক্যান্সারের থেকে সবচেয়ে দুরারোগ্য অসুখ হিসেবে শুচিবাইকে যদি চিন্হিত করা হয় তাহলে কিন্তু কোনো ভুল হবে না।এই রোগ কিভাবে ডিপ্রেশনের থেকেও বাজে প্রভাব ফেলে এই জীবনে তা নিয়ে আমরা এখন বিস্তারিত বলবো।কিন্তু তার আগে দীপিকার গল্পটা শেষ করে নেই।

দীপিকা যখন এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন তখন তার কেমন লেগেছিল?

একাধিক সাক্ষাতে তিনি বলেছিলেন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গোছানো থাকলেই তার ভালো লাগে, অগোছানো পরিবেশ তার ভীষণ অপছন্দ। জামা কাপড় এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে তার মজাজ অনেক খারাপ হয়ে যায়।তখন দীপিকা নিজেও জানতেন না যে তিনি OBSESSIVE COMPULSIVE DISORDER নামের এই ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত।চিকিৎসকের পরামর্শ শুনে যতদিনে বুঝতে পেরেছেন ততদিনে অসুখটি তার মনে শরীরে জায়গা করে নিয়েছে একেবারে শক্ত করে।

OBSESSIVE COMPULSIVE
DISORDER:

OCD বা শুচিবাই একটি উদ্বেগজনিত রোগ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় এই চিকিৎসা অক্ষমতার দশটি রোগের মধ্যে একটি।শুচিবাই মোটেই বিরল কোনো রোগ নয়।সারা বিশ্বে প্রতি পঞ্চাশ জনের মধ্যে একজন কোনো না কোনো পর্যায়ে এই রোগে ভুগেন।সাধারনত শৈশব ও কৈশোরে এইব্রফটি শুরু হয়।নারী ও পুরুষ উভয়ই এই রোগে ভুগতে পারেন।নিকট আত্মীয়দের মধ্যে এই রোগ হওয়ায় আশঙ্কা পাঁচ গুণ বেশি।গুরুত্বের দিক থেকে বিষন্নতা,ফোবিক ডিসঅর্ডার,মাদক আশক্তির পর পরই আসে শুচিবাই এর নাম।এই রোগের ব্যাপকতা অনেক বেশি।আর তাই এই রোগটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়।কোনো কিছু একবারের জায়গায় দুই আর চেক করা একটা সাধারণ আচরণ।ধরা যাক রাতে শোয়ার আগে গেটের তালা ঠিকমত লক করেছেন কিনা কিংবা বাইরের রুমের লাইট নিভিয়েছেন কিনা সেটা যাচাই করা এই কাজগুলো একবারের জায়গায় আপনি দুইবার করতেই পারেন ভুলভ্রান্তি আছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।কিন্তু আপনি যদি রাতে শোয়ার আগে গেটের তালা ঠিকমত লক করেছেন কিনা কিংবা বাইরের রুমের লাইট নিভিয়েছেন কিনা সেটি নিশ্চিত করার জন্য অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাঁচ থেকে সাত বার করে ফেলেন তাহলে তখন বুঝতে হবে ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়।এখানে সমস্যা আছে,বড় ধরনের সমস্যা।
OBSESSIVE COMPULSIVE
DISORDER মূলত একটি মানসিক রোগ।মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ থেকেই এর জন্ম।এটি এমনই একটি রোগ যাতে আবেশ বা বাধ্যতা অথবা দুটিই থাকতে পারে।আবেশ অর্থ হলো একই চিন্তা,কোনো ছবি বা ইচ্ছা মনের মধ্যে বারবার গুরপাক খাওয়া।একত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে তার এই ভাবনা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তবুও সে তার ইচ্ছা বা চিন্তাকে কোনোভাবেই আটকাতে পারে না বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সাময়িকভাবে দেখা দেয় অসস্তি।যেমন:
দরজায় তালা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসে পৌঁছানোর পর হঠাৎ খেয়াল হলো দরজায় তালা দিয়েছে কিনা তা মনে করতে পারছেন না।এই চিন্তাটা বারবার মনে আসতে থাকায় শরীরে একটা অসস্তি তৈরি হয়।বাধ্যতা হলো ওই চিন্তা ভাবনা কমানোর জন্য মানুষ যে কাজগুলো করেন সেগুলো।যেমন:
কোনো মানুষ যদি আগের উদাহরণের কাজের জন্য বারবার চিন্তা করে আর এই চিন্তা দূর করার জন্য আবার বাসায় গিয়ে চেক করল যে সে কি দরজায় তালা লাগিয়েছে কিনা।শুচিবাই রোগে আক্রান্ত রোগীদের আবেশ বা বাধ্যতা দুটিই কিন্তু একসাথে ঘটতে পারে।
ধরা যাক ধর্ম বা যৌনতা নিয়ে অস্বাভাবিক কোনো চিন্তা তার মনে বারবার ঘোরপাক খাচ্ছে।সেটিকে তিনি সত্য নয় বলেই জানেন।যেটিকে তিনি মন থেকে সরাতে চাচ্ছেন কিন্তু তিনি পারছেন না তখন তার মনের অবস্থা কি হতে পারে?
অনেকে আছেন নামাজে দাড়িয়ে নামাজ ছেড়ে দেন উল্টা পাল্টা চিন্তা মনে আশার কারণে।অনেকে জানেন তার কোনো শারীরিক অসুখ নেই কিন্তু সে তার পরেও ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাতে থাকেন। এসএসসিতে ভালো ফলাফল করা ছাত্র এইচএসসিতে এসে একটি বইয়ের একটি পৃষ্ঠায় বারবার পড়ছে কারণ পরের পৃষ্ঠায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হতে থাকে আমি তো আগের পৃষ্ঠা পড়িনি।এভাবে দেখা যায় যে সে একটা কুপের মধ্যে আটকা পড়েছে।পড়াশোনা ও খেলাধুলার অনেক ক্ষেত্রে আবেশের দরকার আছে কিন্তু সেটা যখন মাত্রায় অতিরিক্ত হয়ে যায় অথবা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তখন এটাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

কেনো মানুষ  শুচিবাই রোগে আক্রান্ত হয়?

 অনেক রোগের যেমন কারণ বের হয়েছে।কিন্তু পৃথিবীতে থাকা সব রোগের এখনও কারণ জানা যায়নি।এর মধ্যে একটি রোগ হচ্ছে শুচিবাই।কেউ কেউ বলেন মস্তিষ্কের কিছু কিছু জায়গায় ফানশন কম হওয়ার কারণে, কেউ বলেন কিছু কিছু নিউরো কেমিকেলের তারতম্যের কারণে, কেউ আবার বলেন জেনেটিক কারণে।এর মধ্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সামান্য কিছু তারতম্য থাকার কারণকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।গবেষকদের মতে OCD এর জন্য বংশগত কারণ যদি ৫৫ ভাগ দায়ী হয়ে থাকে তাহলে পারিপার্শিক কারণ দায়ী ৪৫ ভাগ। বংশগত কারণ ছাড়াও এটা হতে পারে।পারিপার্শ্বিকতা এই শুচিবাই রোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।বাল্যকালে শারীরিক বা যৌন লাঞ্ছনার শিকার হলে পরবর্তীতে মানুষ অনেক সময় এই রোগে আক্রান্ত হয়। বাল্যকালে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও অনেকের মধ্যে এই বীজ বুনে দেয়।সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময়ে মায়ের শুচিবাইতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি থাকে।তবে একটা বিষয় একেবারে সবাই নিশ্চিত যে মানুসিক চিন্তা অনেকাংশে দায়ী।শিশুরা মানুসিক চাপের বিষয়টা সবার সামনে প্রকাশ করতে পারে না তাই তাদের প্রকাশভঙ্গি বড়দের থেকে কিছুটা ভিন্ন হয়।স্কুলে ভর্তি বা পরীক্ষার চাপ,সহপাঠীদের সাথে তুলনামূলক আলোচনা শিশুদের মনে অভিভাবকদের অজ্ঞাতেই একটি কালো ছায়া ফেলে।বয়ঃসন্ধিকাল OCD শুরু হওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখে।কিশোর বয়সে বিয়ে,বাচ্চা প্রসবও প্রভাব ফেলে এতে।জীবনের যে কোনো ঘটনা দিয়ে রোগটি শুরু হতে পারে। ব্যক্তি জীবনের মানুসিক চাপ,রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ময়লা আবর্জনা থেকেও কিন্তু এই রোগটি হতে পারে।তবে খুব কম ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যার কারণে এটি হয়ে থাকে।

কিভাবে OCD একজন মানুষকে মানুসিক রোগে আক্রান্ত করে?

মস্তিষ্কের স্নায়ু রাসায়নিক সেনোটনিমের বিপাক ক্রিয়ার ফলে এই OCD হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।হয়তো আপনি এই রোগে অনেক দিন আগে থেকেই ভুগছেন কিন্তু আপনি সেটা জানেন না।যে চিন্তাটাকে চাইলেও আপনি মাথা থেকে সরাতে পারেন না।এর ফলে আপনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আপনার পারিবারিক ও বাইরের জীবনে।এটি থেকে কেউ বাঁধা দিলে আপনি রাগ করছেন, ঝগড়া করছেন সবার সাথে।এর ফলে আপনারই একমাত্র সামাজিক দুরত্ব ও শারীরিক দুরত্ব বাড়ছে।এর ফলে আপনি বিষন্নতা, ফোবিয়া, পেনিক ডিসঅর্ডারে ভুগতে পারেন।এগুলোর কারণে মানুষ অনেক সময় আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।তখন যদি আপনার ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সেগুলোও আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

আপনি এই OCD রোগ থেকে বাঁচার জন্য কি কি করতে পারেন?

OCD এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি বা ফার্মাকোথেরাপি মধ্যে যেকোনো একটি আবার দুটি থেরাপি দেয়ার কথা বলা হয়।তবে গবেষকরা বলছেন দুই পদ্ধতি যাদের মধ্যে প্রয়োগ করা হয়েছে তাদের ফল ভালো এসেছে।সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসার ক্ষেত্রে (COGNITIVE BEHAVIORAL THERAPY) খুব উপকারী।এখানে রোগীর ভুল চিন্তাগুলোর উপর কাজ করা হয়।আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে PHARMACOTHERAPY।এইখানে রোগীদের কিছু ঔষধ দেয়া হয়।যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে তারা যদি টানা ছয় মাস ডাক্তারের দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী চলে তারা একবারেই ভালো হয়ে যায়।কিন্তু রোগটি দ্বারা আপনি আবার আক্রান্ত হতে পারেন।তখন আবার আপনাকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।
এইসব রোগীদের কিছু নিয়ম একেবারে ভালো করে মেনে চলতে হবে।সেগুলো হলো:
1.তাদেরকে নিয়মিতই ইয়গা, শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।এই ধরনের কাজ তাদের দুশ্চিন্তা দূর করতে সাহায্য করবে।

2.পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম চর্চা করতে হবে।

3.বর্জন করতে হবে অ্যালকোহল ও নিকোটিন জাতীয় খাবার।

4.মিষ্টি জাতীয় খাবার কোনোমতেই খাওয়া যাবে না।

5.বিশুদ্ধ ফল ও শাকসবজি খেতে হবে।
অন্যান্য রোগ যেমন মানুষ নিয়ম মেনে চলে নিয়ন্ত্রণে রাখে ঠিক তেমনি এই ধরনের রোগীরাও যদি নিয়ম মেনে চলে তাহলে তারাও এই রোগ থেকে দ্রুত বের হতে পারবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.